\ যুদ্ধে গিয়ে জানতে পারলেন, তিনি একজন শত্রু | Bangla Photo News
Thursday , September 20 2018
Homeমুক্তমতযুদ্ধে গিয়ে জানতে পারলেন, তিনি একজন শত্রু
যুদ্ধে গিয়ে জানতে পারলেন, তিনি একজন শত্রু

যুদ্ধে গিয়ে জানতে পারলেন, তিনি একজন শত্রু

বাংলা ফটো নিউজ : সৈন্যদের কাহিনী যুদ্ধের মতোই পুরনো। এসব গল্প বলার পরই মানুষ ভুলে যায়। সবসময়ই এমন কিছু তরুণ নারী-পুরুষ থাকে, যারা গৌরব অর্জনের জন্য উৎসাহী। সহিংসতা ঘটানোর ক্ষমতা তাদের প্রলুব্ধ করে এবং মৃত্যু নিয়ে যাদের কারবার, তাদের স্বার্থে এরা প্রাণ দেয়। সৈন্যদের কাহিনী একই- যুদ্ধের পর যুদ্ধে, প্রজন্মের পর প্রজন্মে এটাই দেখা যায়।

এখন আমরা স্পেন্সার র‌্যাপোনের কাহিনী শোনাব। এই (মার্কিন) সেকেন্ড লেফটেন্যান্টকে অমাননাকর বরখাস্তের শিকার হতে হয়েছে। ১৮ জুন তাকে সেনাবাহিনী থেকে বিদায় নিতে হলো। কারণ, তদন্তে নাকি প্রমাণিত হয়েছে, তিনি ‘সমাজতান্ত্রিক’ বিপ্লবের উদ্দেশ্যে এবং সিনিয়র অফিসারদের হেয় করার জন্য অনলাইনে প্রচারণা চালিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে স্পেন্সার যা করেছেন, তা একজন ‘আর্মি অফিসারের জন্য বেমানান’। অবশ্য তিনি মিথ্যার স্বরূপ উন্মোচন করে দিয়েছেন, যদিও এ ধরনের মিথ্যাকে প্রায় সময়ে আক্রমণ থেকে নিরাপদ মনে করা হয়। তার মতো যারা যুদ্ধ সম্পর্কে সত্য কথা বলার মতো নৈতিক সাহস রাখেন, তাদের মর্যাদা দেয়া উচিত। কথিত দেশপ্রেমের সরব প্রপাগান্ডার জোয়ারে ন্যায়ের কণ্ঠ ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলেও তারা সত্য বলে যান।

স্পেন্সার র‌্যাপোনে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মিতে যোগ দিয়েছিলেন ২০১০ সালে। জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট বেনিংয়ে তাকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিমানবাহিত সেনাদের স্কুলে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে তিনি হলেন রেঞ্জার। তিনি বুঝতে পারলেন, তার আশপাশের অন্য সেনারা নিজ নিজ অস্ত্রকে এত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে যে, এটা এক ধরনের বোকামি মাত্র। ফোনে যখন স্পেন্সারের সাথে কথা হলো, তিনি বলছিলেন, ‘রাইফেল দেখলে বোঝা যায়Ñ পদাতিক সৈন্য মানে কী? তাদের শেখানো হয়, ‘রাইফেল হলো তোমাদের নিজের একটি সম্প্রসারিত অংশ, যা তোমাদের জীবনতুল্য।’ সর্বদাই এটা বয়ে বেড়াতে হবে। স্পেন্সারের ভাষায়, রাইফেল সৈন্যদের যোদ্ধা বানায় যারা মুখোমুখি লড়াই করে; দুশমন খতম করতে জান বাজি রাখে। একেবারে প্রথম দিকে এটা ছিল খুশির ব্যাপার। আমরা ছিলাম আঠারো বছরের একদল তরুণ। কারো কারো বয়স মাত্র এক বছর বেশি। রাইফেলরূপী মৃত্যুর হাতিয়ার থাকত আমাদের হাতে। আমাদের ক্ষমতা এত বেশি ছিল যে, দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ যা করতে পারত না, আমরা তা পারতাম। হাতিয়ার মানুষকে বদলে দেয়। আপনি তখন সংঘর্ষে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে চাইবেন। মৃত্যুকে সরবরাহ করাই হবে আপনার চাওয়া। এভাবে সৈনিক জীবন আপনাকে শুষে তার ভেতরে টেনে নেবে। আপনি শুরু করে দেবেন কৌশলগত তৎপরতা আর যুদ্ধ করার মহড়া। এভাবে কোনো একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছলে সৈনিক জীবনের প্রতি প্রলুব্ধ হবেন। সামরিক জীবন মননশীলতার মূলোচ্ছেদ করে সৈনিককে আবেগ-অনুভূতিহীন করে তোলে।’

স্পেন্সারের চার পাশে এবং তাকে নিয়ে যা ঘটছিল, এতে তার মনের শান্তি বিনষ্ট হচ্ছিল। ট্রেনিংয়ের সময় রেঞ্জার সেনাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি অনুধাবন করাই যথেষ্ট নয়। স্পেন্সার বলেছেন, অনলাইনে গিয়ে ওই সব রেঞ্জারদের ব্যাপারে ভালোভাবে জানতে বলা হয়, যারা অ্যাকশনে অবতীর্ণ হয়ে মারা গেছে। ট্রেনিংদাতাদের একজনের কথা শুনে স্পেন্সার কৌতূহলী হয়ে ওঠেন প্যাট টিলম্যান সম্পর্কে। জানা গেল, টিলম্যান ছিল একজন পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড়। রেঞ্জার্সে যোগ দেয়ার পর সে ২০০৪ সালে আফগানিস্তানে নিহত হয়েছে। তার মৃত্যুর কারণ ‘বন্ধুসুলভ গুলি’ (Friendly Fire) এবং সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তারা ব্যাপারটা ধামাচাপা দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল স্ট্যানলি এ ম্যাকক্রিস্টালও। টিলম্যানের মৃত্যু সম্পর্কে হলিউডের স্টাইলে বানোয়াট কাহিনী ছড়ানো হলো যে, সে শত্রুর সাথে সংঘর্ষে প্রাণ হিয়েছে। ২০১০ সালে স্পেন্সার একটি ডকুমেন্টারি দেখেন যার নাম The Tillman story : পরে তিনি পড়েছিলেন প্যাট টিলম্যানের ভাইয়ের লেখা After pat’s Birthday. ২০০৮ সালে লিখিত এই কাহিনীতে টিলম্যানের মৃত্যু সম্পর্কে সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। তার ভাই কেভিনও মার্কিন রেঞ্জার্স বাহিনীর সদস্য ছিলেন এবং তিনিই এই রচনার লেখক। আসলে নোয়াম চমস্কির সাথে যোগাযোগ ছিল টিলম্যানের। ক্রমেই যুদ্ধের সমালোচক হয়ে ওঠে টিলম্যান। সেনাবাহিনী তার মৃত্যু নিয়ে মিথ্যাচার করা ছাড়াও তার ডায়েরিসহ নথিপত্র ফেরত দেয়নি। সম্ভবত এসব ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।
স্পেন্সার র‌্যাপোনে বলেছেন, টিলম্যান দেখিয়েছে- মগজধোলাই করাকে প্রতিরোধ করা যায়। সামরিক বাহিনী আমাকে মানবতাহীন করে দানবীয় কিছু বানিয়ে ফেলুক- এটা তো চাইতে পারি না। যখন জেনেছি, যুদ্ধের স্বার্থে টিলম্যানের মৃত্যুর কারণ লুকানো হয়েছিল, তখন মর্মাহত হলাম। সামরিক বাহিনী স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র সংরক্ষণ করতে চায়নি। বরং শুধু ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষা করতে এবং মার্কিন আধিপত্যের প্রসার ঘটাতে চেয়েছে। আর আমি নিজে পরিণত হয়েছিলাম সাম্রাজ্যবাদের একটি বিরাট যন্ত্রের গুরুত্বহীন সামান্য অংশে। আমাদের শিকার যারা, তারা এই গ্রহের সবচেয়ে গরিব আর সর্বাধিক শোষিত মানুষ। আমাদের নির্দেশ দেয়া হতো, ‘গুলি চালাও, এগিয়ে যাও এবং যোগাযোগ করো।’ এটাই ছিল অস্তিত্বজুড়ে। কেন গুলি করতে হবে, তা বোঝার দরকার বোধ করা হতো না। কিন্তু এটা আমাদের উদ্বেগ সৃষ্টি করেনি।’

যা হোক, ২০১১ সালের জুলাই মাসে স্পেন্সার ছিলেন আফগানিস্তানের খোস্ত প্রদেশে। তার বয়স তখন ১৯ বছর। ছিলেন এসিস্ট্যান্ট মেশিন গানার। তার অস্ত্র ছিল গশ-৪৮ যার ওজন ১৮ পাউন্ড। তেপায়ার ওপর বসিয়ে, এটি দিয়ে প্রতি মিনিটে ৫০০ থেকে সোয়া ৬০০ রাউন্ড গুলি ছোড়া যায়। স্পেন্সারকে গুলির বোঝার সাথে অতিরিক্ত ব্যারেলও বহন করতে হতো। রাতে অন্যান্য রেঞ্জার তাদের ঘরদুয়ার পরিষ্কার করত। তখন স্পেন্সার অন্য কাজে থাকতেন। রেঞ্জাররা ভীতসন্ত্রস্ত নারী, পুরুষ, শিশুদের এমনভাবে আলাদা করত যেন তারা মানুষ নয়, পশু। স্পেন্সার এটা পর্যবেক্ষণ করতেন। রেঞ্জাররা আফগানদের মানুষ মনে করত না। ওদের হেয় করে বলত, ‘হাজি’ আর ‘মাথায় ন্যাকড়া পরা’।

স্পেন্সার বলেছেন, তখন আমাদের অনেকেই বলত, প্রতি রাতে বেরিয়ে লোকজনকে হত্যা করতে চাই। রেঞ্জাররা অতি পৌরুষশক্তি প্রদর্শন করতে চাইত। তারা নারীদের করত ঘৃণা। বর্ণবিদ্বেষ আর অন্যদের সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণাও তাদের বৈশিষ্ট্য। স্পেন্সারদের প্লাটুন সার্জেন্ট ছিল শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী। এ জন্য তার বাহুতে ‘থর’-এর হাতুড়ির উল্কি আঁকা ছিল। এই সার্জেন্ট নবাগত রেঞ্জারদের বলত, হকচকিত হয়ে পড়ার মতো কিছু দেখে সে ব্যাপারে মুখ খুলতে চাইলে মনে করা হবে, ‘তোমরা এখানকার উপযুক্ত নও।’

স্পেন্সার র‌্যাপোনে ২০১২ সালে রেঞ্জারদের ছেড়ে ওয়েস্ট পয়েন্টে চলে যান। তিনি হয়তো একজন অফিসার হিসেবে ব্যতিক্রমধর্মী হয়ে তার ঘাতক বাহিনীর মধ্যে কিছুটা মানবতা সঞ্চারিত করতে পারতেন। অবশ্য এ ব্যাপারে তার সন্দেহ ছিল। তার ভাষায়Ñ রেঞ্জারে থাকাকালে যা দেখেছি, ওয়েস্ট পয়েন্টে এসেও সেরকম অনেক কিছু নজরে পড়েছে। খুনের দায়মুক্তির ব্যাপারকে ছোট বড় অফিসাররা বেশ উপভোগ করত। এটা (ঔপনিবেশিক আমলের ব্রিটিশ লেখক) রুডিয়ার্ড কিপলিংয়ের মতো মানসিকতা। শত শত বছর ধরে তরুণ ব্রিটিশ সৈন্যদের মন-মানস ছিল এমনই। এহেন অতিপৌরুষের স্বভাব আয়ত্ত করতে হয় মহিলা ক্যাডেটদেরকেও। নারীসুলভ কমনীয়তাকে দুর্বলতা মনে করা হয়। এর সাথে মিশে আছে মজ্জাগত বর্ণবিদ্বেষ। (মার্কিন) সৈন্যরা আজো সম্মান করে (গৃহযুদ্ধকালীন) কনফেডারেশনপন্থী জেনারেল রবাট ই লিকে। ওয়েস্ট পয়েন্টে তার নামে ব্যারাক আছে। সেখানে লাইব্রেরিতে আছে কনফেডারেট ইউনিফর্ম পরিহিত লির ছবি। একই ছবিতে একজন ক্রীতদাসকেও দেখা যায়।

স্পেন্সার দেখেছেন, যে নিয়মভঙ্গের দায়ে শ্বেতাঙ্গ ক্যাডেটদের শাস্তি হতো না, একই ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গদের লাথি মেরে বের করে দেয়া হতো। এটা দেখে তার ক্রোধ বেড়ে যায়। তিনি ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন। সিলেবাসের বাইরে পড়েছেন হাওয়ার্ড জিন আর স্ট্যান গফের মতো গ্রন্থকারের রচনা। তারা ভিয়েতনাম, হাইতি, পানামা, কলম্বিয়া ও সোমালিয়ায় যুদ্ধ করেছেন। এই দু’জনের লেখা বই হলো : Hideons Dream : A soldier’s Memoirs of the US Invasion of Haiti (বীভৎস স্বপ্ন : হাইতিতে মার্কিন অভিযান সম্পর্কে একজন সৈনিকের স্মৃতিকথা)।

স্পেন্সার বলেন, ‘বুঝতে পারলাম আমরা তাদের জন্য পেশিশক্তির ভূমিকা রাখি, যারা সম্পদ ও সম্মানের অধিকারী।’ স্পষ্টবাদিতা ও সমালোচনার জন্য তাকে ভর্ৎসনা করা হয়। স্পেন্সার জানান, ওয়েস্ট পয়েন্টে ট্রেনিংয়ের শেষ দিকে তিনি সমাজতন্ত্রী হয়ে গিয়েছিলেন। তার কথা, রাজনৈতিক অর্থনীতি আর বিভিন্ন থিওরি অধ্যয়ন করলে নিজের বিশ্লেষণ ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নানা তথ্য অবগত হওয়া যায়। শুধু তাত্ত্বিক অধ্যায় নয়, তিনি চেয়েছেন সেই তথ্যকে কাজে প্রয়োগ করতে।
স্পেন্সারকে কথিত কমিউনিস্ট ক্যাডেন্ট হিসেবে নিন্দা করা হলো। বর্ণের কারণে এবং নারী কিংবা মুসলিম হওয়ার দরুন যারা মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে বৈষম্যের শিকার, তাদের তিনি খুঁজে বের করলেন। নিজে মুসলমান না হলেও তিনি যোগ দিলেন মুসলিম ক্যাডেট অ্যাসোসিয়েশনে। এর কারণ হিসেবে তার উক্তি : মুসলিম ক্যাডেটরা যাতে একটা প্লাটফর্ম পায়, এ জন্য তাদের সাহায্য করতে চেয়েছি; তারা যাতে বোঝে যে, তাদের কথা ভুলে যাওয়া হয়নি। ওয়েস্ট পয়েন্টে বেশি লোক ছিল না যারা ইসলামকে উপলব্ধি কিংবা প্রশংসা করত অথবা কিভাবে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি দেশগুলোকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে, তা অনুধাবন করত।’ মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে যাতে মুসলমানেরা নামাজ আদায়ের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা পান, সেজন্য উদ্যোগ নেয়া হলে স্পেন্সার এতে সাহায্য করেন। এ কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে তাকে উত্তপ্ত বিতর্কে জড়াতে হয়েছে।

অ্যাকাডেমির একজন প্রফেসর স্পেন্সারকে বললেন, তিন চার বছর ধরে তোমার ওপর নজর রাখছি। তুমি মনে করো, যাচ্ছেতাই করতে পারবে। এই শিক্ষক সোস্যাল মিডিয়ায় তার অ্যাকাউন্টগুলো পরীক্ষা করে দেখলেন, স্পেন্সার বামপন্থী প্রকাশনার প্রবন্ধ এবং সিরিয়ার শরণার্থীদের ব্যাপারে মার্কিননীতির সমালোচনা করে পোস্ট দিয়েছেন। এ জন্য তার বিরুদ্ধে ফাইল পাঠানো হলো সিআইডি এবং সামরিক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের কাছে। তাকে এক শ’ ঘণ্টার শাস্তিমূলক সফরে যাওয়ার আদেশ দেয়া হয়। বাধ্য করা হয় ওয়েস্ট পয়েন্টের সেন্ট্রাল স্কোয়ারে, প্রতি সপ্তাহে পুরো ইউনিফর্ম পরিধান করে বার বার সামনে পেছনে হাঁটতে। এটা করতে হয়েছে, যে পর্যন্ত না এক শ’ ঘণ্টার শাস্তি সম্পন্ন হয়েছে। স্পেন্সারের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে তাকে বঞ্চিত রাখা হয় ৬০ দিন। বসন্তকালীন অবকাশ তাকে দেয়া হয়নি। ওই সময়ে শাস্তিস্বরূপ তাকে দিয়ে চাকরের কাজ করানো হয়েছে।
বলা হয়ে থাকে, ‘ওয়েস্ট পয়েন্টে ৫০ কিংবা ৬০-এর দশকের মতো কাউকে হয়রানি করা হয় না।’ বাস্তবে এখানে নবাগতদের সাথে এমন আচরণ করা হয়, যেন তারা নিম্নশ্রেণীর মানুষ। প্রত্যেক রাতে ‘উচ্চশ্রেণী’র লোকজনের বর্জ্যগুলো এরা বাইরে ফেলে আসতে বাধ্য হয়। কারো সাথে কথা বলার অনুমতি নেই নবাগতদের। তাদের দু’হাত গুটিয়ে রেখে ‘অ্যাটেনশন’ ভঙ্গিতে হাঁটতে হয়। কোনো সহপাঠীর সাথে কথা বললেই শাস্তি পেতে হবে। সবচেয়ে মন্দ ব্যাপার হলো, নবাগতরা সিনিয়র হয়ে গেলে ওরাও তাদের জুনিয়রদের সাথে একই ধরনের অমানবিক আচরণ করে থাকে।

রেঞ্জার্স বাহিনীতে যারা নতুন, তাদের পরস্পর মারামারি করতে বাধ্য করা হয়। তাদের পেটে বারবার মারা হয় ঘুষি। যারা রেঞ্জার্সদের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি মেনে নিতে পারে না, তারা নিজেদের আলাদা করে নেয়। নেতৃস্থানীয় একজন এমনকি, আত্মহত্যার প্রয়াস পেয়েছিল। স্পেন্সার ওয়েস্ট পয়েন্টে যখন ছিলেন, সে সময় কয়েকজন মিলিটারি ক্যাডেট আত্মহত্যা করেছে। আরো কয়েকজন এ জন্য চেষ্টা চালিয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীতে আট বছর থাকাকালে স্পেন্সার দেখেছেন আত্মহননের নানা ঘটনা। এর একটা কারণ, হয়রানির শিকার হওয়া। মানসিক নিপীড়ন করা হয় প্রশিক্ষার্থীদের।
ওয়েস্ট পয়েন্ট থেকে গ্র্যাজুয়েশন অর্জনের পর স্পেন্সার র‌্যাপোনেকে আবার পাঠানো হয় ফোর্ট বেনিংয়ে। সেখানে এক সপ্তাহ পরপর শুক্রবারে একটা করে বেসিক ট্রেনিং ক্লাস হতো। তখন সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ ক্যাডেটদের কঠিন পরিশ্রমের কাজ করতে হতো। স্পেন্সারকে বলা হলো যাতে তিনি ওদের জানান যে, এসব কাজ ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এটা বলতে পারতেন না। স্পেন্সার এ কাজ ছেড়ে দেয়া কিংবা মুখখোলার সুযোগ খুঁজছিলেন। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় একদিন কলিন কিপারনিক নামের ক্যাডেট প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। পরিকল্পিতভাবে বর্ণবিদ্বেষ পোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করার ঝুঁকি নিয়েছিল সে। তখন স্পেন্সার ভাবলেন, এ ক্ষেত্রে তিনিও ভূমিকা রাখতে পারেন। কিপারনিকও টিলম্যানের মতো প্রতিবাদের ঝুঁকি নিয়েছিল এবং ক্ষমতাবানদের সামনে সত্যকে তুলে ধরতে চেয়েছে।

এদিকে, স্পেন্সারের বিভিন্ন ভূমিকার কারণে তার ব্যাপারে তদন্ত করা হয়। পরে মার্কিন সেনাবাহিনীর দশম মাউন্টেন ডিভিশন তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছে। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যেন দেশপ্রেমে উদ্বেল। দেশটির সামরিক কর্তাদের ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে বলে মনে করা হয়। অথচ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস একজন যুদ্ধাপরাধী। ইরাকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে তিনি বোমা ফেলেছেন। সে দেশে অনেক গণহত্যার দায় বর্তায় তার ওপর। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাকমাস্টারও এজন্য দায়ী। কিন্তু মনে করা হয়, তারা কোনো ভুল করেন না। এহেন মনোভাব সামরিক শাসন এবং ফ্যাসিবাদকে মেনে নেয়ার পরিবেশ তৈরি করে দেয়।’ এমন প্রেক্ষাপটে স্পেন্সার সেনাবাহিনী ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।

স্পেন্সার র‌্যাপোনে দুঃখ করে বলেন, মার্কিন জনগণ বোসে না, তাদের সামরিক বাহিনীর অপসংস্কৃতি কতটা পশ্চাৎমুখী ও ‘বিষাক্ত’। সেনাদের মজ্জাগত স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্যদের প্রতি দুর্ব্যবহার ও অবমাননা। তাদের তৈরি করা হয়েছে ধ্বংসের বাহন হিসেবে। তাদের একটি মানবিক বাহিনীতে উন্নীত করা সম্ভব নয়। হারিকেন ক্যাটারিনার পর নিউ অরলিয়েন্সে মানবিক কার্যক্রমে তাদের নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু সেনাবাহিনী আগের মতোই রয়ে গেছে। সেনাদের ট্রেনিং দেয়া হয়, যেন তারা বিশেষত বাদামি ও কালো চামড়ার মানুষকে ‘আসন্ন হুমকি’ বলে মনে করে।

স্পেন্সার বলেন, ‘মার্কিন মিলিটারি এটা বলে গর্ববোধ করে যে, তারা অরাজনৈতিক। অথচ তারা হচ্ছে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শক্তি। কোনো সৈনিক যখন ভাবে, তার কোনো রাজনৈতিক ভূমিকা নেই, তখন তার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক বিষয় খুব কমই থাকতে পারে। কিভাবে অস্ত্র চালাতে হয়, এটা জানার চেয়ে অনেক বড় ব্যাপার সৈনিক হওয়া। অর্জিত শিক্ষা ও জ্ঞানকে তারা সমাজের জন্য কাজে লাগাতে পারে। ট্রেনিংয়ের সময় চরিত্র ও নৈতিকতার কথা বলা হলেও বাস্তবে কী দেখা যায়? অন্ধের মতো আদেশ নির্দেশ পালন করে দরিদ্রতম জনগণের প্রতি সহিংস আচরণ করেছি। এর কোনো নৈতিক ভিত্তি আছে কি?’

লেখক : ক্রিস হেজেস, সাবেক প্রতিনিধি নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং গ্রন্থকার ও কলামিস্ট (ভাষান্তর : মীযানুল করীম)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*