\ হুমকিতে পড়তে পারে স্পিনিং খাত | Bangla Photo News
Monday , October 15 2018
Homeঅর্থনীতিহুমকিতে পড়তে পারে স্পিনিং খাত
হুমকিতে পড়তে পারে স্পিনিং খাত

হুমকিতে পড়তে পারে স্পিনিং খাত

বাংলা ফটো নিউজ : দেশে বেনাপোল এবং চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সুতা আমদানি করা হলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চায় পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়েও সুতা আমদানি করতে। যদিও এর তীব্র বিরোধিতা করছে এ খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। তাঁদের আশঙ্কা এ বন্দর ব্যবহার করে অসত্য ঘোষণায় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে সুতা আমদানি হবে। এতে দেশের সাড়ে ৩ লাখ তাঁতশিল্প, দেশীয় শাড়ি, লুঙ্গি ও বস্ত্র খাতের স্পিনিং মিলগুলো হুমকির মুখে পড়বে। এ ছাড়া এ বন্দর দিয়ে সুতা আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে তৃতীয় কোনো দেশের সুতা নেপালের সুতা বলে বাংলাদেশে সরবরাহ করা হবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানায়, নেপালে সুতার কোনো কল নেই। এমনকি ভারতের যেসব অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে সুতা আসে ওই অঞ্চলগুলো বাংলাবান্ধা সীমান্তের একবারে বিপরীতমুখী অবস্থানে। এ ছাড়া অবকাঠামোহীন এই স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি করার কথা বলে একটি অসাধু মহল বস্ত্রশিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে। যেন দেশের তৈরি পোশাক খাতের নিয়মিত প্রবৃদ্ধি ও সার্বিক অর্থনীতি ও স্পিনিংশিল্প হুমকির মুখে পড়ে।

জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে এনবিআরের সদস্য খন্দকার মুহাম্মদ আমিনুর রহমানের সভাপতিত্বে নেপাল থেকে বাংলাবান্ধা স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে সুতা আমদানির অনুমতি নিয়ে একটি সভা হয়। ওই সভায় বস্ত্র খাতের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ ও বিটিএমএর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তারা নেপালে যেহেতু সুতা তৈরি হয় না, এমনকি কোনো স্পিনিং মিল নেই তাই বাংলাবান্ধা দিয়ে সুতা আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই বলে মত দেন। এ ছাড়া সুতা আমদানিকারকদের পরিবহন খরচ ও সময় বেশি লাগবে।

এদিকে একই সভায় বাংলাবান্ধার শুল্ক স্টেশনের কর্মকর্তা রিজভী আহমেদ জানান, বন্দর দিয়ে সুতা আমদানির মতো প্রয়োজনীয় জনবল, পণ্যের গুদামজাত করা ও সুতা পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার নেই। ফলে ওই সভায় সুতা আমদানিতে এ বন্দর ব্যবহারের প্রয়োজন নেই এমন সিদ্ধান্ত হলেও ফের বিষয়টি নিয়ে চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে পুনর্বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানায় এনবিআর। উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন একটি দুষ্টচক্র এর মধ্যে কাজ করছে। তাই বিষয়টি নিয়ে তাঁরা শিগগিরই বাণিজ্যমন্ত্রীর শরণাপন্ন হবেন। এরই মধ্যে সময় চেয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছে সুতা ও বস্ত্র খাতের সংগঠন বিটিএমএ।

জানতে চাইলে বস্ত্র খাতের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সহসভাপতি মো. আলী খোকন বলেন, নেপালে কোনো সুতার কল না থাকলেও নেপাল থেকে সুতা আমদানির জন্য দেশের সর্বশেষ স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা দিয়ে সুতা আমদানির অনুমতির জন্য এনবিআর খাতসংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করে। ওই বৈঠকে আমরা সুতা আমদানির জন্য বাংলাবান্ধা বন্দরের প্রয়োজন নেই; বোঝাতে সক্ষম হলেও এনবিআর ফের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য সভা করে। তাই আমাদের আশঙ্কা হয় দেশের সুতা ও বস্ত্র খাত নিয়ে একটি অসাধু মহল ষড়যন্ত্র করছে। এর ফলে তৃতীয় কোনো দেশ থেকে সুতা বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেশের বস্ত্র খাতকে অস্থিতিশীল করে তোলার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে এ খাতের ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এনবিআরের সদস্য খন্দকার মুহাম্মদ আমিনুর রহমান বৈঠকে থাকার কথা স্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। এনবিআরের সদস্য খন্দকার মুহাম্মদ আমিনুর রহমান বৈঠকে থাকার কথা স্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য আমাদের চিঠি দিলে আমরা বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএকে তাদের মতামত জানাতে চিঠি দিই। এরই মধ্যে তারা নেপাল থেকে সুতা আমদানির বিষয়টি প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে। এ ছাড়া আমরাও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হোক এমনটা চাই না। নেপালের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনাই ছিল এর মূল কারণ। এ ছাড়া এ ব্যাপারে এখনো আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। ব্যবসায়ীদের এ ব্যাপারে শিগগিরই জানিয়ে দেওয়া হবে।

বিটিএমএ সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রতিবছর সুতার চাহিদা আছে ১৪ লাখ টন। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় ১০ লাখ টন। আমদানি করা সুতা চীন, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারত থেকে আসে। এর অর্ধেকই আসে ভারত থেকে। উদ্যোক্তারা মনে করেন সরকারের নীতি সহায়তা পেলে কিছু উচ্চ মূল্যের সুতা ছাড়া বাকিটুকুও দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব।

বিটিএমএ দেশের বেসরকারি খাতের প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের স্পিনিং উইভিং ডায়িং-প্রিন্টিং এবং ফিনিশিংয়ের একটি বড় খাত। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪৫০টি স্পিনিং মিল আছে। এসব কারখানার স্পিন্ডেল ক্ষমতা ১১ দশমিক ৪০ মিলিয়ন। এর বিপরীতে সুতা উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে দুই হাজার ৫৯০ মিলিয়ন কেজি, যা প্রায় মোট চাহিদার ৭০ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া স্পিনিং খাতে ছয় থেকে সাত লাখ শ্রমিক সরাসরি জড়িত।

ঢাকা থেকে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বর্তমানে সুতা আমদানি করা হয়। ঢাকা থেকে বেনাপোলের দূরত্ব মাত্র ২৩৩ কিলোমিটার। অন্যদিকে বাংলাবান্ধা সীমান্ত প্রায় ৪৬৪ কিলোমিটার। এর ফলে আমদানিকারকদের পরিবহন খরচ দিগুণ হারে বাড়বে। বেনাপোল থেকে পণ্য সংগ্রহ করা হলে ট্রাকপ্রতি ভাড়া হবে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে বাংলাবান্ধা থেকে পণ্য পরিবহনে খরচ হবে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।

জানা যায়, দেশের সর্বশেষ সীমান্ত পঞ্চগড়ে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। এর বিপরীতে ভারতের কোচবিহার। বিটিএমএর মতে ভারতের কোচবিহারে কোনো সুতা কল নেই। সুতা কলগুলো মূলত মহারাষ্ট্র ও অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যে। এ রাজ্যগুলো বাংলাদেশের বেনাপোলের কাছাকাছি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার যদি বেনাপোল দিয়ে সুতা আমদানিতে নিষেধ না করে তাহলে তো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এর ফলে অন্য কোনো দেশ থেকেও আমাদের পণ্য আনা-নেওয়া সহজ হবে। আর এতে যার সুবিধা হবে, তিনিই ওই বন্দর ব্যবহার করবেন। আর অসত্য ঘোষণায় আমদানি বন্ধ করা এবং উদ্যোক্তাদের শঙ্কার জায়গায় আস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্বও সরকারের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*