\ সিনহার ব্রোকেন ড্রিম হুজুগের হাটে হট ইস্যু | Bangla Photo News
Wednesday , December 19 2018
Homeমুক্তমতসিনহার ব্রোকেন ড্রিম হুজুগের হাটে হট ইস্যু
সিনহার ব্রোকেন ড্রিম হুজুগের হাটে হট ইস্যু

সিনহার ব্রোকেন ড্রিম হুজুগের হাটে হট ইস্যু

বাংলা ফটো নিউজ : রাজনীতির ময়দানে ইস্যুর এক্সপ্রেসে হার্ডব্রেক ঘটাল সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বই ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’। পুরো নাম এ ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি। তা গত কদিন থেকে রাজনীতির বাজারে চলা আলোচনা-সমালোচনার ইস্যুগুলোয় ছন্দপতন ঘটিয়েছে। মার খাইয়ে দিয়েছে আগামী নির্বাচন, নির্বাচনকালীন সরকার, আন্দোলন, জোট, এমনকি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের হট ইস্যুকেও।

ক্ষমতাসীনদের জন্য সিনহার বই কিছুটা বিব্রতকর ও অস্বস্তির। এর পরও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দেরি হয়নি। আওয়ামী লীগের স্পোকসম্যান, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, পদ হারানোর জ্বালায় বিদেশে বসে ভুতুড়ে কথা বলছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। বইটিতে বিএনপিসহ সরকারবিরোধীরা অনেকটাই খুশিতে আটখানা। এটি তাদের কাছে অমৃত বচনের মতো। এ কারণে প্রতিক্রিয়ার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছেন বিএনপির কেউ কেউ।

এসকে সিনহা নামে বেশি পরিচিত সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ইস্যু খতম হয়ে গেছে অনেক আগেই। অতীতের খেরোখাতায় চলে যাওয়া ঘটনা নতুন করে টেনে এনেছেন রাজনীতির মাঠে নতুন ধাঁচে আলোচিত ড. কামাল হোসেন। গত ১২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সঙ্গে আয়োজিত সভায়। সভাটি হয় সমিতির সম্পাদক বিএনপি নেতা এএম মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঞ্চালনা ও সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে। সেখানে সাম্প্রতিক নানা ঘটনার সঙ্গে ড. কামাল টেনে আনেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রসঙ্গ। বলেন, সিনহাকে যারা অপমানিত করছেন, তারা অসভ্য। তাদের বিচার একদিন হবেই।

বিচারপতি সিনহার সঙ্গে দেশসেরা আইনজীবী গণফোরাম সভাপতি ড. কামালের বিশেষ খায়খাতির নিয়ে আগে থেকেই বিরক্ত সরকার। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও। সিনহার সঙ্গে মিলে ড. কামাল দেশে বিচার বিভাগকে দিয়ে ক্যু ঘটাতে চেয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে সরকারি মহল থেকে। ড. কামাল এ ধরনের অভিযোগকে পাত্তা দেননি। জবাব দেওয়ার দরকারও মনে করেননি। তবে নির্বাচনের আগমুহূর্তে অনেকটা বার্তা দেওয়ার মতো সেদিন বক্তব্য রাখেন এ নিয়ে। তার বক্তব্যে বেশ খুশি হয়েছেন আইনজীবী সমিতির বিএনপিপন্থি নেতারা। স্বাভাবিকভাবেই সরকার ও আওয়ামী লীগের জন্য এটি কষ্টের। ক্ষোভের। এর মাঝেই সুদূর আমেরিকা থেকে প্রকাশ হলো সিনহার ব্রোকেন ড্রিম। এটি কাকতালীয়, না এর সঙ্গে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক যোগসূত্র রয়েছে? এ প্রশ্ন সরকারকে তাড়া করবেই। উদ্বেগ বাড়াবেই।

বইতে সিনহা যেসব বর্ণনা দিয়েছেন, তা একেবারে পিলে চমকানোর মতো নয়। হাটে হাঁড়ি ভাঙা বললে বেশি হয়ে যাবে। কেন, কোন প্রেক্ষিতে তাকে পদত্যাগ-দেশত্যাগ করতে হয়েছে, এর পূর্বাপরের ঘটনার অনেক কিছুর ভাসা-ভাসা মানুষের জানা হয়ে গেছে অনেক আগেই। বইতে তিনি লিখেছেন বিস্তারিত। তা বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষের জানাশোনার সঙ্গে অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর বাইরে ছোটখাটো ও আশপাশের কিছু ঘটনাবলিও তুলে এনেছেন এসকে সিনহা। বইয়ের পিডিএফ ফাইল অনেকের পড়া হয়ে গেছে এরই মধ্যে। বিবিসি, টাইম টিভিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বই ও তার নিজের সম্পর্কে বক্তব্যও প্রকাশ হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় ‘বলি’ হয়েছেন বলে দাবি তার। আরও দাবি করেছেন, সরকারের চাপের মুখেই তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। সরকারের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে অব্যাহত চাপ এবং হুমকির মুখে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ এবং দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন তার এ দাবি বইতে সদ্য এলেও মানুষ জানে তখনই। এর পরও তার জানানো বিশেষ গুরুত্ববহ।

২০১৭ সালে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল-সংক্রান্ত একটি মামলার আপিলের রায়কে কেন্দ্র করে সরকারের সঙ্গে তার বিরোধ তখন গণমাধ্যমে কমবেশি প্রচার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন থেকে প্রকাশিত বইটিতে বিচারপতি সিনহা লিখেছেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়টি যেন সরকারের পক্ষে যায়, সে জন্য তার ওপর ‘সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে চাপ তৈরি করা হয়েছিল’। এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই তাকে পদত্যাগ ও দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।

বইয়ের ভূমিকায় সিনহা লিখেছেন প্রধানমন্ত্রী এবং তার দলের অন্য সদস্য ও মন্ত্রীরা পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য আমার কঠোর নিন্দা করেন। প্রধানমন্ত্রীসহ কেবিনেট মন্ত্রীরা আমার বিরুদ্ধে অসদাচরণ এবং দুর্নীতির অভিযোগ এনে বদনাম করতে শুরু করেন। …আমি যখন আমার সরকারি বাসভবনে আবদ্ধ, আইনজীবী ও বিচারকদের আমার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছিল না, তখন সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় আমি অসুস্থ, আমি চিকিৎসার জন্য ছুটি চেয়েছি। …একাধিক মন্ত্রী বলেন, আমি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাব। …অক্টোবরের ১৪ তারিখ, যখন আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হই, তখন একটি প্রকাশ্য বিবৃতিতে আমি পরিস্থিতি স্পষ্ট করার চেষ্টায় একটি বিবৃতি দিই যে আমি অসুস্থ নই এবং আমি চিরকালের জন্য দেশ ছেড়ে যাচ্ছি না। …আমি আশা করছিলাম যে, আমার প্রত্যক্ষ অনুপস্থিতি এবং আদালতের নিয়মিত ছুটি এ দুটো মিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সহায়ক হবে এবং শুভবুদ্ধির উদয় হবে, সরকার ওই রায়ের যে মর্মবস্তু, অর্থাৎ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যে জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর, তা বুঝতে পারবে। …শেষ পর্যন্ত দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, যার নাম ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স তাদের ভীতি প্রদর্শন এবং আমার পরিবারের প্রতি হুমকির সম্মুখীন হয়ে আমি বিদেশ থেকে আমার পদত্যাগপত্র জমা দিই…।

বইয়ের বাইরে বিবিসি, টাইম টিভিসহ কয়েকটি গণমাধ্যমকে এসব বিষয়ে ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিচারপতি সিনহা। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, …আমাকে যখন কমপ্লিটলি হাউস অ্যারেস্ট করা হলো, তখন বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিদিন একজন করে ডাক্তার আমার কাছে পাঠানো হতো। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। …এর মধ্যে ডিজিএফআইয়ের চিফ এসে বললেন, হ্যাঁ আপনাকে বলা হলো আপনি বিদেশ যাবেন, আপনি যাচ্ছেন না। …আমি বললাম, কেন যাব আমি বিদেশে? …আপনি চলে যান, আপনার টাকা-পয়সার আমরা ব্যবস্থা করছি। …আমি বললাম, এটা হয় না, আমি আপনাদের টাকা নেব না। আর আপনারা বললেই আমি ইয়ে করব না। আমি চাই সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমি আলাপ করি। ব্যাপারটা কি হয়েছে আমি জানতে চাই। (তিনি) বলেন, প্রধানমন্ত্রী আপনার সঙ্গে কথা বলবেন না।

বাংলাদেশের পার্লামেন্টে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের ইমপিচ করার ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে পার্লামেন্টের সদস্যদের দেওয়ার পর ২০১৬ সালের ৫ মে হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি বিশেষ বেঞ্চ ওই সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন। সরকার এর বিরুদ্ধে আপিল করে এবং সাত সদস্যের একটি বেঞ্চে আপিলের শুনানি হয়। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার বইতে লিখেছেন …জুলাইয়ের ৩ তারিখ প্রধান বিচারপতি হিসেবে তার সভাপতিত্বে সুপ্রিমকোর্ট বেঞ্চ আপিল খারিজ করে হাইকোর্ট ডিভিশনের রায় বহাল রাখে। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের ১ তারিখ সর্বসম্মত রায়ের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি লেখেন …ওই সিদ্ধান্তের পর সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখে পার্লামেন্ট একটি প্রস্তাব পাস করে, যাতে সেই রায়কে বাতিল করার জন্য আইনি পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়।

সব মিলিয়ে হুমকি-ধমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যাচার, গৃহবন্দিত্ব এবং এসব ন্যক্কারজনক কাজে প্রধানমন্ত্রী, সরকার এবং ডিজিএফআইয়ের তৎপরতার স্বরচিত বর্ণনা দিয়েছেন এসকে সিনহা। এসবের বেশ কিছু লোকমুখে শোনা, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে কমবেশি জানা হয়ে গেছে মানুষের। এর পরও হুজুগের মতো বই মারফতে নতুন করে জানার তাগিদ কারো কারো রয়েছে। থাকাই স্বাভাবিক। চাহিদার জোগান দিতে ইংরেজি বইটির বাংলা তরজমাও বাজারজাত হবে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি পদে আসীন হতে, আসীন হয়ে বাড়তি কী কী করেছেন সেসব কিছু লেখেননি, যা তার জগতের অনেকেরও বিশেষ স্ট্যান্ডার্ড। না লিখলেও মানুষ কিছু জানে। কিছু বোঝে। পদ পেতে আর পদ রক্ষা করতে এ দেশে কী করতে হয়, কী করতে হয় না বহু অকর্মাও তা জানে। ভবিষ্যৎ ভেবে সেই সবের কিছু ভয়েজ রেকর্ডও রেখে দেয় শেয়ান সরকার। সুবিধা নিশ্চিতের প্রতিযোগিতায় রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ীসহ অনেকেই এ সুবিধা হাছিলের দৌড়মুক্ত নন। সরকারগুলোও তাদের কাজে লাগায় সেই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই।
লেখক: মোস্তফা কামাল, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*