\ শিশুর জন্য চার সুরক্ষা | Bangla Photo News
Friday , November 16 2018
Homeমুক্তমতশিশুর জন্য চার সুরক্ষা
শিশুর জন্য চার সুরক্ষা

শিশুর জন্য চার সুরক্ষা

বাংলা ফটো নিউজ : একজন মানবশিশুকে গড়ে তুলতে এবং তার প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটাতে এবং তাকে যাবতীয় মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখতে সবসময় এক ধরনের পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে হয়। তাকে শারীরিক-মানসিক উভয় দিকে সুস্থ-সবল রাখতে হয় এবং বুদ্ধি ও সঠিক উপায়-উপকরণের জ্ঞান অন্বেষণ করতে হয়। জ্ঞান অর্জন করতে হয়। শিশুর মানসিক অবস্থা বুঝে শিশুদের আমরা এমন সব প্রতিকূল পরিস্থিতি উত্তরণে যোগ্য করতে সক্ষম হই, যেন তারাই যোগ্য হয়ে একসময় কর্মক্ষেত্রে দেশের জন্য অবদান রাখতে পারে।

মনে পড়ে ছোটবেলায় পড়া একটি ছড়ার কথা। ‘আম পাকে বৈশাখে, কুল পাকে ফাল্গুনে, কাঁচা ইট পাকা হয় পোড়ালে তা আগুনে। রোদে জলে টিকে রঙ পাকা কই তাহারে’। কাদা মাটিকে আগুনে পুড়িয়ে ইট বানানো হয়; সেই ইট-রড-সিমেন্টের সংমিশ্রণে হাজার টন সহ্য করার উপযোগী ইমারত তৈরি করা হয়; তেমনি শিশুবেলায় সন্তানদের সুনাগরিক তৈরির উদ্দেশ্যে যথার্থ শিক্ষা দান করতে পারলে, তার দ্বারা পরিবার ও সমাজের পাশাপাশি রাষ্ট্র গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়। আর শিশু যদি সে সময় মন্দ কোনো অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তা হলে জীবনব্যাপী এর প্রভাব থাকে। আচরণবাদের প্রবক্তা রুশ শারীর বিজ্ঞানী আইভান প্যাভলভ প্রাণীর আচরণ নিয়ে গবেষণার ফলাফলে বলেন, মানুষ বা প্রাণী যে আচরণে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, জীবনব্যাপী তাকে সে আচরণই তাড়া করবে। মানুষের জীবনের সর্বক্ষেত্রে এমন আচরণের নজির পাওয়া যায়। শিশুবেলায় সঠিকভাবে হাত ধোয়া, ব্রাশ করা, খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা ইত্যাদি শেখালে সব বিষয়েই পরবর্তী জীবনে তার আচরণ লক্ষ্য করা যায়। দুঃখের বিষয়, আমরা অভিভাবকেরা এসব বিষয়ে মনোযোগী তো নয়-ই, বরং আসলে তাদের ক্ষতি সাধনে ব্যস্ত।

প্রথমেই আসি ধূমপানের বিষয়ে। ধূমপান মানে জেনেশুনে বিষ পান তা প্রমাণিত। বিশ্বে ধূমপানে প্রতি সেকেন্ডে একজন মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর দুই লাখ লোক ধূমপানজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ধূমপানে মারা যায় মোট মৃত্যুর ১৬ শতাংশ। এত কিছুর পরও সাময়িক সুখের আশায় আমরা ধূমপান ত্যাগ করতে পারি না। এ দেশে জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে তামাক সেবনে অভ্যস্ত। ফলে নিজে তো মরছিই, সাথে অন্যদেরও আয়ু দিচ্ছি কমিয়ে। পরিবারে বাবা-ভাই ধূমপান করেন। হাটে-মাঠে সর্বত্র চলে দেদার ধূমপান। শিশু তা দেখে ধূমপান যে স্বাস্থ্যহানিকর, নিজের ও সমাজের ক্ষতির কারণ তা বুঝে উঠতে গিয়ে দোটানার মধ্যে পড়ে যায়। নিরুপায় শিশু প্রতিবাদ করতে পারে না।

তাকে কোলে নিয়ে ঘনিষ্ঠজনের ধূমপানে তার বলার কিছু থাকে না। অথচ পরোক্ষ ধূমপান শিশুর অপরিপক্ব তন্ত্রে রোগের সূচনা ঘটায়। তার বৃদ্ধির প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। পরিবার হয় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন। শিশুর ভবিষ্যৎ এমন অন্ধকার করার কোনো অধিকার কারো নেই। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে বহু মানুষ। তার মধ্যে শিশু বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ধূমপানের বিরুদ্ধে আইন আছে, প্রয়োগ নেই। সকাল থেকে রাত; স্থান-কাল-পাত্রের বিবেচনা না করে ধূমপান করা হয়। মাঠে ঘাটে সর্বত্র যেন বেপরোয়া ধূমপানের প্রতিযোগিতা চলে। কোনো হাটে প্রবেশ করলে ধূমপায়ীর কারণে বেশিক্ষণ থাকা দায়। পাবলিক প্লেসে ধূমপান দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও তা কেউ মানছে না। কোমলমতি শিশুদের সর্বনাশা ধূমপানের ছোবল থেকে রক্ষা করতে চিরতরে ধূমপানের মূলোৎপাটনে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

দুই. দ্বিতীয়ত যে বিষয়টির আলোচনা অতীব জরুরি, তা ‘শিশুর নিরাপদ পুষ্টিকর’ খাবার। আমরা খাবার খাই শক্তি ও দেহে সুচারু পরিচালনা ও বৃদ্ধির জন্য। ওই উদ্দেশ্য সাধনে সঠিক সময়ে উপাদানসমৃদ্ধ সুষম খাবার প্রয়োজন। কিন্তু আমরা ইচ্ছে থাকলেও তেমন খাবার খেতে পারছি না। খাবারে ভেজাল আছে কি-না তা পরীক্ষা না করে, বরং কোনটায় কত ভেজাল আছে তা দেখাই শ্রেয়। তরিতরকারি থেকে শুরু করে ভোজ্যপণ্য, এমনকি শিশুদের খাবারেও ভেজালের উপস্থিতি। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) জরিপে শিশুদের খাবার, কেকে ৭০ শতাংশ, বিস্কুটে ৪৬ শতাংশ, চাটনিতে ৮৩ শতাংশ ভেজাল পাওয়া যায়। বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (বাপা) উদ্যোগে ঢাকার ২৯টি এলাকায় এক পরীক্ষায় আমে ৮২ শতাংশ, কলায় ৯১ শতাংশ, মাল্টায় ১০০ শতাংশ, আপেলে ৫৯ শতাংশ, আঙ্গুরে ৯৫ শতাংশ, খেজুরে ৭৭ শতাংশ ফরমালিনের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। এটা আমাদের আতঙ্কিত করে।

খাবারের নামে নানা রোগের বীজ বুনে দেয়া হচ্ছে। সচেতন বাব-মা দ্বিধাগ্রস্ত! সন্তানকে কী খাওয়াবেন এ চিন্তায়? গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের অনুপাতে বাংলাদেশের মানুষের শারীরিক বৃদ্ধি হ্রাস পাচ্ছে। এ জন্য ভেজাল, ফরমালিনের ভূমিকাই প্রধান। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই একটি শিশুকে সুস্থ সবল করে গড়ে তুলতে সচেষ্ট থাকা দরকার। তাকে নিয়মিত দিতে হবে সুষম খাবার। মুখরোচক ফাস্ট ফুডের প্রতি আসক্তি কমাতে হবে। তিন বেলাই পাতে উপাদানসমৃদ্ধ সব খাবার রাখতে হবে। শর্করা পেতে খাওয়াতে হবে চাল থেকে তৈরি করা খাবার। আমিষ পেতে খাওয়াতে হবে মাছ, গোশত, ডিম, ডাল। ভিটামিনের জন্য খাওয়াতে হবে ফলমূল ও রঙিন শাকসবজি। ফ্যাট বা স্নেহ পেতে খাওয়াতে হবে পরিমাণ মতো তৈল জাতীয় খাবার।

বিজ্ঞানের মতে, দৈনিক একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ২৭০ থেকে ৪৫০ গ্রাম শর্করা, ৪৮ গ্রাম আমিষ (মাঝারি সাইজের এক থেকে চার পিস মাছ বা গোশত, আধা কাপ ডাল), ১০০ গ্রাম শাক ও ২০০ গ্রাম সবজি এবং দুই-তিন টেবিল চামচ তেল খাওয়া প্রয়োজন। শিশুর বেলায় এ সবই খাওয়াতে হবে বয়স অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে। পানিও খাওয়াতে হবে পর্যাপ্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দিনে একজন মানুষের ৪৩ মিলিলিটার পানি পান করা উচিত। সাথে উত্তম অভ্যাসেরও অনুশীলন করাতে হবে। শিশুদের খাবারের এতসব কিছুতে অভ্যস্ত করার প্রধান দায়িত্ব পালনকারী হবেন তার বাবা-মা। বাবা পরিকল্পনানুযায়ী বাজার করে প্রতিদিন বিভিন্ন উপাদানসমৃদ্ধ খাবার (শাক-সবজি, মাছ, ডিম, দুধ, গোশত, ডাল) আনবেন এবং মা রুটিন অনুযায়ী রান্না করে সন্তানদের তা খাওয়াবেন। শিশুরা এমন উত্তম অভ্যাসে সারা জীবন যাপন করবে। সুঠাম-সুচারুরূপে বেড়ে উঠবে। একসময় তার অধীনস্থদেরও সে তাতে অভ্যস্ত করাবে। ধারাবাহিকভাবে প্রজন্ম পরম্পরা এমন অভ্যাসে অভ্যস্ত হবে। দেশের মানুষ সুস্থ সবল থাকবে; ফলে জাতি উন্নত হবে।

তিন. শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে নানা বিষয়ে সে জ্ঞান লাভ করে। প্রথমে সামগ্রিকভাবে, পরে নির্দিষ্টভাবে কোনো বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে সে জানতে পারে। আমরা যেমন এক শিখেই এক শ’ শিখিনি; যোগ-বিয়োগ না শিখে গুন-ভাগ শিখিনি, তেমনি একটি শিশু ধীরে ধীরে তার বয়স অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে শেখা স্বাভাবিক। অল্প বয়সে তাকে পড়ালেখার জন্য চাপ দেয়া ঠিক হবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বর্তমানে বইয়ের বোঝা ও মুখস্ত বিদ্যা শিশুর শারীরিক মানসিক বিকাশে বাধা দিচ্ছে। হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন, শিশুর ওজনের ১০ শতাংশের বেশি হবে না বইয়ের ওজন। আমাদের সে বিষয়ে সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমরা তা করছি না। শিশুদের একেকজন মহাপণ্ডিত বানাতে আমরা ব্যস্ত। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠা স্কুলগুলো শিশুদের চাপ দেয়, তেমনি আমরা অভিভাবকরাও তোড়জোড় করে শিশুকে কষ্ট দেই। এ-প্লাস পেয়ে ক্লাসে সর্বোচ্চ নম্বরধারী হতেই হবে সন্তানকে, এটা কেমন কথা!

অভিভাবকেরা যেমন জোর করে তাকে খাওয়ান, তেমনি জোর করে তাকে পড়ানও। প্লে-নার্সারিতে পড়–য়া একটি কচি শিশুকে কেন ক্লাসে সর্বোচ্চ নম্বরধারী হতে হবেই এটা বুঝে আসে না। এটা অসুস্থ এক প্রবণতা। শিশুকে ধারণ ক্ষমতার বেশি দিলে সে নেবে কিভাবে? পড়ার এমন চাপে শিশুরা মানসিক বিকাশের নানা অনুষঙ্গের সাথে যুক্ত হতে পারে না। শিশু বয়সে শিক্ষার্থীর স্কুলে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্যই হলো, পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়া ও ‘সামাজিক’ হতে অভ্যস্ত করা। পড়ালেখার বহু সময় তার হাতে আছে। এখন তার মাত্র শুরু। অযথা চাপ দিয়ে পড়ালেখার প্রতি উল্টো অনীহা সৃষ্টি করবেন না। তার ভিতটাকে মজবুত করুন। তাকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন।

চার. এ পর্যায়ে আলোচিত বিষয় হলো, শিশুর নানা মন্দ কাজের প্রতি আসক্তি। প্রথমে স্বাভাবিকভাবে চলে আসে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের প্রতি আসক্তির কথা। বর্তমানে শিশুদের না খাইয়ে সারা দিন ডিভাইস চালানোর সুযোগ দিলে সে মা-বাবাকে কোনো ‘জ্বালাতন’ করে না। দীর্ঘ দিনের এমন অভ্যাসে একসময় সে বদরাগী হয়ে ওঠে এবং আসক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আমাদের বুঝতে হবে, প্রকৃতি ও পরিবেশের বিষয়গুলো হলো ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডি)। টিভি গেইমের বিষয়গুলো দ্বিমাত্রিক (টু-ডি) অর্থাৎ, টু-ডাইমেনশনাল। শিশুরা টিভি ও গেইমে দেখা বিষয়গুলো বাস্তবে অনুশীলন করতে চায়। কিন্তু এর সামঞ্জস্য না পেয়ে নানা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্ম দেয়। তখন শরীরের পাশাপাশি তার মনও ভালো থাকে না। পড়ালেখায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলে।

পরীক্ষায় ফল খারাপ করে। এসব কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলায় বুদ্ধিমানের কাজ হবে, আগেই নিজে সতর্ক হওয়া। শিশু নতুন কিছু দেখলে আকৃষ্ট হয়। তাই শুরুতেই মোবাইল, ট্যাব, কম্পিউটার, টিভির ব্যবহার সীমিত করুন। প্রয়োজনে তার থেকে এসব দূরে রাখুন। সন্তানকে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সাথে বন্ধুত্ব গড়ার সুযোগ দেবেন না। বই পড়ার অভ্যাস করুন। সন্তান পড়তে শিখলে তার উপযোগী বই পড়তে উৎসাহিত করুন। তার আশপাশে বই রাখুন। অবসরে তাকে গল্প, ছড়া ইত্যাদি পড়ে শোনান। ছোটবেলা থেকেই তাকে সাহিত্যের অনুরাগী করে তুলতে পারেন। পত্রপত্রিকা পড়ার অভ্যাসও করাতে পারেন। দীর্ঘক্ষণ টিভি না দেখিয়ে গঠনমূলক প্রোগ্রাম নিজে সাথে থেকে দেখান। এসব বিষয় নিয়ে তার সাথে আলোচনা করুন। ছুটির দিনে ওকে কোথায়ও বেড়াতে নিয়ে যান। সর্বোপরি সন্তানকে ভালোর সঙ্গী বানাবেন, কোনো ডিভাইসের নয়।
লেখক: সোহেল আহমদ, ahmedsohel656@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*