বাংলা ফটো নিউজ : বর্তমান আধুনিক বিশ্বের রোগগুলোকে প্রধানত দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়। একটি জেনেটিক (বংশগত রোগ) অন্যটি এনভায়রনমেন্টাল (পরিবেশগত)। জেনেটিক রোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বেশির ভাগ জেনেটিক রোগ জন্মের আগে নির্ণয় করা সম্ভব। এতে যেমন মা গর্ভধারণ করার পর সন্তান প্রসব করবেন কিনা তা নির্ধারণ করতে পারেন, অন্য দিকে জেনেটিক রোগের কারণে শিশুর যে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা হতে পারে; এ ব্যাপারে বাবা-মা আগে থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। লিখেছেন অধ্যাপক ডা: মো: তাহমিনুর রহমান (সজল) ও অধ্যাপিকা ডা: হোসনে আরা তাহমিন (চারু)
বর্তমান আধুনিক বিশ্বের রোগগুলোকে প্রধানত দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়। একটি জেনেটিক (বংশগত রোগ) অন্যটি এনভায়রনমেন্টাল (পরিবেশগত)। জেনেটিক রোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বেশির ভাগ জেনেটিক রোগ জন্মের আগে নির্ণয় করা সম্ভব। এতে যেমন মা গর্ভধারণ করার পর সন্তান প্রসব করবেন কিনা তা নির্ধারণ করতে পারেন, অন্য দিকে জেনেটিক রোগের কারণে শিশুর যে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা হতে পারে; এ ব্যাপারে বাবা-মা আগে থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।
বিভিন্ন ধরনের জেনেটিক রোগ আছে। এর মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য জেনেটিক রোগ হলো- ডাউন্স নিসড্রোম, ক্লিনফিলিয় সিনড্রোম, মোজাইসিজম, ঠোঁট বা তালু কাটা, কিডনিতে অনেক সিস্ট হওয়া, হেমোফাইলিয়া-এ এবং বি, আলফা ও বিটা থ্যালাসেমিয়া, কনজেনিটাল হাইপো-থাইরয়ডিজম ইত্যাদি।
এখানে বলে রাখা ভালো, আমাদের শারীরিক, মানসিক বৃদ্ধি নির্ভর করে বাবা-মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত জেনেটিক ফ্যাক্টর ও এনভাইরনমেন্ট বা পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর। জেনেটিক রোগ বলতে সাধারণত ক্রমোজোমের অস্বাভাবিকতা, জিন মিউটেকান ও ডিএনএ সিকুয়েন্সের বিভিন্ন অস্বাভাবিকতাকেই বোঝায়।
জেনেটিক রোগগুলো বাবা-মার জন্য শিশুর জন্মদান আশীর্বাদ না হয়ে বোঝা হয়ে দেখা দেয়। কারণ, ডাউন সিনড্রোমের শিশুর ইডিওটিক হবে, শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি হবে না, প্রতিবন্ধী হবে। হার্টসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। মোজাইসিজম হলে শিশু ক্লিব হবে। সারাজীবন সংসারে বোঝা হয়ে থাকবে। থ্যালাসেমিয়া বিশেষত বিটা থ্যালাসেমিয়া হলে শিশুদের সব সময়ই রক্তশূন্যতা এবং এর অন্যান্য লক্ষণ উপস্থিত থাকবে। নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন করতে হবে এবং পরবর্তীতে রক্ত পরিসঞ্চালনের বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শিশু মারা যাবে। হেমোফাইলিয়া হলে শিশুদের রক্তপাতজনিত সমস্যা বিশেষত জয়েন্টে রক্ত জমাট বাঁধবে। এ জন্য জেনেটিক ডিজিজ আগে থেকে নির্ণয় করে এরপর স্বামী-স্ত্রী মিলে নির্ধারণ করতে হবে, তারা সন্তান নেবেন কি-না।
জেনেটিক রোগ নির্ণয় যাদের জন্য বেশি দরকার।
* যে মেয়েদের ৩৫ বছর বয়সের উর্ধ্বে বিয়ে হবে এবং পরবর্তীতে গর্ভধারণ করবে।
* স্বামী-স্ত্রী যাদের আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বিয়ে হয়েছে যেমন- মামাত, চাচাত, ফুফাত ভাইবোন।
* যে সব শিশুর গর্ভাবস্থায় জেনেটিক রোগ ধরা পড়েছে।
* যে সব মহিলা আগে বড় এবং অস্বাভাবিক সন্তান প্রসব করেছেন।
* আগের কোনো শিশু কোনো কারণ ছাড়াই শারীরিক ও মানসিক অস্বাভাবিকতায় ভুগছে।
* বারবার গর্ভে সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে বা মিসড এবরশন হয়েছে।
* যে সব বাবা-মায়ের এন্ডোক্রাইন ডিসফাংশন ক্লিনিক্যাল বা রক্তের পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়েছে।
কি কি জেনেটিক এবং অন্যান্য টেস্ট করা যায়
ক) বার বডি টেস্ট- যে সব শিশুদের লিঙ্গ বোঝা যাবে না, অর্থাৎ ছেলে না মেয়ে বোঝা যাবে না, তাদের এই টেস্ট করাতে হবে।
খ) কারিওটাইপিং- আমাদের প্রত্যেকের ক্রমোজোম সংখ্যা ৪৬। পুরুষের বেলায় 46xy মহিলাদের 46xy। সুতরাং ক্রমোজোম সংখ্যা বেশি না কম তা এই টেস্টে বোঝা যাবে।
গ) পিসিআর ডিএনএ’র কোনো অস্বাভাবিকতার কারণে জন্মগত।
ঘ) রিকম্বিনেট ডিএনএ টেকনোলজি- অস্বাভাবিকতা নির্ণয়।
ঙ) রেস্ট্রিকশন ফ্রাগমেন্ট এনালাইসিস।
চ) হেমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস- থ্যালামেসিয়া আছে কিনা এবং কোন টাইপের তা নির্ণয় করা যাবে।
ছ) ক্লাটিং ফ্যাক্টর এসে এবং ক্লাটিং টাইম- হেমোফাইলিয়া এ এবং বি নির্ণয় করা যাবে।
জ) শিশুদের কর্ডব্লাড, এমনিওটিক ফ্লুইড দিয়ে শিশুদের কোনো জন্মগত ত্রুটি আছে কিনা তা নির্ণয় করা যাবে।
ঝ) বিভিন্ন হরমোন টেস্ট যেমন থাইরয়েড হরমোন, গ্রোথ হরমোন ইত্যাদির মান নির্ণয় করা।
জেনেটিক ডিজিজ প্রতিরোধের উপায়
ক) আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বিয়ে না করা। বিয়ে করলেও জেনেটিক ডিজিজ হওয়ার সম্ভাবনার কারণে সন্তান না নেয়া।
খ) বেশি বয়স বিশেষত মেয়েদের ৩৫ বছরের উপরে বিয়ে না করা এবং বিয়ে করলে পরবর্তীতে গর্ভধারণ পারতপক্ষে না করা।
গ) যে সব মহিলাদের আগে অস্বাভাবিক শিশু হওয়ার ইতিহাস আছে তাদের জেনেটিক রোগ নির্ণয়।
ঘ) জেনেটিক কাউন্সেলিং জেনেটিক ডিজিজ হয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সন্তান না নেয়া।
এ কথা মনে রাখতে হবে, সুস্থ স্বাভাবিক একটি সন্তানই যথেষ্ট। অস্বাভাবিক প্রতিবন্ধী শিশু সংসারের জন্য বোঝা এবং কোনোদিনই তা কারো জন্য কাম্য নয়। এ জন্য জন্মগত বা জেনেটিক রোগ নির্ণয়, কাউন্সেলিং অত্যন্ত জরুরি। সব বাবা-মায়ের এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
Leave a Reply