বাংলা ফটো নিউজ : সন্দ্বীপের একটি ইউনিয়নের নাম উড়িরচর। সারাদেশে যখন উন্নয়নের ছোঁয়ায় পাল্টে যাচ্ছে জনপদ, সেখানে একবিংশ শতাব্দীতেও অন্ধকারে এই জনপদ।
নাগরিক সুযোগ সুবিধার কিছুই নেই এখানে। ইউনিয়ন পরিষদ আছে, নেই পর্ষদ। ১৯ বছর আগে নির্বাচন হলেও আর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি এ ইউনিয়নের বাসিন্দারা।
জানা গেছে, ২০০৩ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় উড়িরচর ইউনিয়নে। ওই নির্বাচনে জয়ী হন তৎকালীন চেয়ারম্যান খাইরুল আলম। ২০০৫ সাল দুর্ঘটনা জনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হলে আর কোনো নির্বাচন দেখেননি এ এলাকার জনগণ। পরবর্তীতে নোয়াখালী ও সন্দ্বীপের সীমানা জটিলতা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে মামলা গড়ায় আদালতে। বর্তমানে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন থাকার কথা জানিয়েছেন ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম ও সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এস এম এ কাদের।
আব্দুর রহিম বলেন, এই ইউনিয়নে ২০ বছর ধরে আমি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছি। কয়েকটি ওয়ার্ড নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জের অধিনে চলে গেছে। এছাড়া ভাঙ্গন কবলিত আছে আরও কয়েকটি ওয়ার্ড। সব মিলিয়ে ভঙ্গুর অবস্থা এই ইউনিয়নের।
তিনি বলেন, উড়িরচর ইউনিয়নের সীমানা জটিলতা নিয়ে একটি মামলাও রয়েছে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় নির্বাচন বন্ধ।
সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এম এ কাদের বলেন, সীমানা জটিলতায় উড়িরচর ইউনিয়নে নির্বাচন হয়নি বেশ কয়েক বছর। এ নিয়ে একটি মামলাও আদালতে চলমান। মামলাটি কোন পর্যায়ে আছে, তা আমার জানা নেই। বিষয়টি বিচারাধীন তাই কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সীমানা জটিলতা নিয়ে ২০০৮ সালে আদালতে মামলা করেন সাইফুল হক চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি। যিনি ছিলেন কালাপানিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। ২০১১ সালে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হলে নির্বাচনের আগের দিন উচ্চ আদালতের নির্দেশে নির্বাচন স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে মামলার নিষ্পত্তি হলেও সর্বশেষ নির্বাচনেও তফসিল ঘোষণা হয়নি এ ইউনিয়নে।
মামলার বাদি সাইফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এই ইউনিয়নের নির্বাচন থমকে আছে নোয়াখালী আর সন্দ্বীপের সীমানা জটিলতা নিয়ে। এছাড়া ২-৩টি ওয়ার্ড ভেঙে যাওয়ায় আয়তনে ছোট হয়ে এসেছে ইউনিয়নটি।
এ ইউনিয়ন নিয়ে মামলা ছিল কি- না জানতে চাইলে তিনি বলেন, উড়িরচর ইউনিয়ন নিয়ে একটা মামলা ছিল। তবে অনেক আগেই তা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। কি কারণে বর্তমানে নির্বাচন বন্ধ তা আমার জানা নেই।
স্থানীয়রা জানায়, ১৯৮০ সালে সন্দ্বীপের ভাঙ্গন কবলিত জনগোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত হয় উরিরচর ইউনিয়ন। যার গোড়াপত্তন হয় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি আসাদুল হক চৌধুরীর হাত ধরে। পরবর্তীতে এই ইউনিয়নের প্রথম চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের প্রথম নারী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আসাদুল হক চৌধুরীর স্ত্রী তাহমিনা হক চৌধুরী। পরবর্তীতে উড়িরচরের সীমানা জটিলতা নিয়ে মামলা করা সাইফুল হক চৌধুরীও তাহমিনা ও আসাদুল হকের সন্তান।
বর্তমানে উড়িরচরের জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার হলেও উপজেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, এ এলাকার ভোটার সংখ্যা মাত্র ৬ হাজার। এই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বেশিরভাগ অংশ নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া এ ইউনিয়নের ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড নদীগর্ভে বিলিন হয়ে যায়৷ ফলে ভঙ্গুর প্রায় উড়িরচর ইউনিয়নের বাকি ওয়ার্ডগুলোতে এখনও পৌঁছায়নি সরকারি কোনও সুযোগ সুবিধা।
এলাকার বাসিন্দা মিলাদ রাজদ্বীপ বলেন, আমাদের ইউনিয়নে নির্বাচন হয় প্রায় ১৯ বছর আগে। তৎকালীন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার বছর খানেকের মাথায় মারা যাওয়ার পর আর কোনও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এই ইউনিয়নে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন আব্দুর রহিম নামে একজন ইউপি সদস্য।
তিনি বলেন, নির্বাচন না থাকায় এ চরের মানুষের সুযোগ সুবিধা দেখার কেউ নেই। যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে এই চরে এখনও নিশ্চিত হয়নি চিকিৎসা সেবা, শিক্ষার অবস্থাও নাজুক। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর মাত্র কিছুদিন আগে এ জনপদে এসেছে বিদ্যুৎ। তবে এখনও নিশ্চিত হয়নি সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো।
দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় বিষয়ে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসানুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান।
এই জনপদে কোনও জনপ্রতিনিধি না থাকায় সরকারি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ইউনিয়নের বাসিন্দারা। স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা বহুবছর ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। কবে ভোটাধিকার পাবো তাও নিশ্চিত নই। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
তিনি বলেন, বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বাড়ি সন্দ্বীপে। সন্দ্বীপের সন্তান হিসেবে আমাদের ইউনিয়নের মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিলে অন্তত অবহেলিত এলাকার উন্নয়নে সরকারের সুদৃষ্টি মিলবে।
Leave a Reply